Search

লাইট হাউস আপডেট (২৭ মে'২০২০)

Updated: Jun 9, 2020

স্থান- আপফান ঝড়ে বিধ্বস্ত সুন্দরবন.

লাইটহাউসের তৃতীয় দফার টিম আজ রওনা দিয়ে দিয়েছে। Badal Jana, Sanjib BiswasSouvick Chakrabortyকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য কোনও শব্দই যথেষ্ট নয়। কয়েক বস্তা ব্লিচিং, জিওলিন, জল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বাকিটা ওখানে প্রস্তুত করা হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোগে। আমাদের কাজের আপাতত ও সম্ভাব্য পরিকল্পনাটি রইল।

"অজস্র ফোন, মেসেজ এসেছে। বহু মানুষ বহু জায়গায় মেনশন করেছেন। সকলেই একটাই কথা বলেছেন। আমফান বিধ্বস্ত সুন্দরবনের পাশে দাঁড়াতে লাইটহাউস কবে উদ্যোগ নেবে। ইমিডিয়েট যাঁদের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাঁদের কাছে আগাম ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু এ বিষয়ে দুটো কথা বলার আছে।

প্রথমত, এত বড় একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সুষ্ঠু ভাবে কোনও কাজ করার জন্য ন্যূনতম পরিকল্পনা খুব জরুরি বলেই মনে করেছিলাম আমরা। সত্যি বলতে, ঘুরতে যাওয়ার জায়গা হিসেবে যে জায়গাটিকে আর কখনও অন্য কোনও ভাবে চিনিনি, যে জায়গায় মিশিনি, সেখানে বিপর্যয়ের মধ্যে বাইরে থেকে গিয়ে পড়াটা নতুন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেই মনে হয়েছিল আমাদের।

আর দ্বিতীয়ত, লাইটহাউস আজ পর্যন্ত যত কাজ করেছে, তার সব ক'টির ক্ষেত্রেই আগে থেকে সদস্যেরা গিয়ে রেইকি করে এসেছেন। কোথায়, কেমন, কতটা, কীভাবে-- এই জায়গাগুলো ক্লিয়ার করে এসে কাজে নেমেছেন তাঁরা। সে কথা জানিয়েওছেন তখনই। এটাই লাইটহাউসের কাজের ধরন। বিশেষ প্রয়োজনেই এ কথাগুলি আজ জানানো।

লাইটহাউস একসময় শুরু হয়েছিল কয়েকটি সমমনস্ক মানুষের একসঙ্গে ভাল কিছু করার উদ্যোগ থেকে। এখন আর এটি শুধুই সমমনস্ক মানুষের যৌথ উদ্যোগ নয়, এটি সংগঠনও বটে। সরকারি ভাবে নথিভুক্ত হওয়া একটি বেসরকারি সংগঠন। সেই সাংগঠনিক দায় থেকেই, মানুষের সাহায্য নিয়ে কাজ করার নীতিবোধ থেকেই যে কোনও কাজ যাতে যতটা সম্ভব সুষ্ঠু, পরিকল্পিত ও অপচয়বিহীন ভাবে হয়, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। এতে সময় লাগে, এতে শ্রম লাগে। এতে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাতে আরও অনেক অসুবিধা এড়ানো যায়।

আমফানের এই কাজে সেই সমস্ত দায়িত্বই আরও অনেক বেশি। অসংখ্য মানুষ অসংখ্য ভাল কাজ করছেন। এত কাজের ভিড়ে এমন একটা কাজ করা অর্থহীন, যে কাজের ফলটুকু সত্যিকারের প্রয়োজনের জায়গায় পৌঁছল না। একইসঙ্গে, সে কাজের ফল যদি কেবলই তাৎক্ষণিক হয়, সেটাও অর্থহীন। তাৎক্ষণিক এক দিনের আনন্দ বিনিময় আমরা প্রায়ই করি। কিন্তু তা এই সুবৃহৎ বিপর্যয়ে যথেষ্ট বা কাঙ্ক্ষিত কোনওটাই নয়।

তাই সেই সময়টুকু আপনাদের কাছে চেয়ে নিয়ে, কাল আমরা যাচ্ছি সুন্দরবনের পথে। এই যাত্রার শুরু অবশ্য আরও আগেই হয়েছে, আমাদের সংগঠনের দুই সদস্য দু'দফায় রেইকি করে এসেছেন আমফান-বিধ্বস্ত সুন্দরবনের কয়েকটি জায়গায়। তাঁদের চোখে দেখে বোঝা পরিস্থিতি, স্থানীয় মানুষের দাবিদাওয়া ও আমাদের ক্ষমতা-- এই তিনটির ভারসাম্য বজায় রেখে একটা প্রাথমিক ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়েছে।

১। গোসাবার রাঙ্গাবেলিয়া এলাকা পার করে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ৫০০টি পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া। এই দায়িত্বের মধ্যে পড়ছে, অন্তত ১৫ দিনের জন্য তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করা। আমাদের পরিকল্পনা ছিল কমিউনিটি কিচেন গড়ে তোলার। কারণ পরিষ্কার কথা, জলমগ্ন এ জীবনে এখন রাঁধা খাবার চাই পেট ভরানোর জন্য। কাঁচা রসদ পেলেও রান্না করার পরিস্থিতি নেই। আমরা সেই পরিকল্পনা সফল করতে পারিনি, কারণ জল। পানীয় জলের মারাত্মক অভাব। হু হু করে নোনাজল ঢুকে নষ্ট করে দিয়েছে সমস্ত পুকুর। ডুবে গেছে নলকূপ। মানুষ অনেক দূর থেকে জল এনে ফুটিয়ে, ছেঁকে খাচ্ছেন। এমন অবস্থায় এত মানুষের রান্নায় যে জল ব্যবহৃত হবে, তাতে ভুল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যেতে পারে। যতদিন না জল সরে দু-একটি পুকুর নতুন করে ভরছে, ততদিন এ কাজে ঝুঁকি থেকে যাবে।

কিন্তু এই কাজটাও হবে কয়েক দিন পরে, আপনারা পাশে থাকলে।

ফলে আপাতত ওঁদের জন্য ডাল, আলু, পেঁয়াজ, সয়াবিন, মুড়ি, বিস্কুট, তৈজসপত্র, সাবান, ব্লিচিং পাউডার-সহ বেশ কয়েকটি আইটেম মিলিয়ে একটি করে খাবার ও জরুরি জিনিসের কিট তৈরি করে দিয়ে আসা হবে, প্রতি পরিবারের ১৫ দিনের সংস্থান হিসেব। ওঁদের যা যা প্রয়োজন, সেটা জেনে নিয়েই জিনিসগুলির তালিকা তৈরি হয়েছে। চাল বাদ রাখা হয়েছে সচেতন ভাবেই।

জলে সব ভেসে যাওয়ার পরে কিছু পরিবার উনুন গড়তে পেরেছে, কিছু পরিবার পারেনি। যাঁদের উনুন রয়েছে, তাঁদের বাড়িতে খেতে আসছেন অন্যেরা। এভাবেই ভাগাভাগি করে ওঁরা কাজ চালাচ্ছেন এখন। আমরা কয়েকটি বাড়িতে নতুন উনুনেরও ব্যবস্থা করব সম্ভব হলে। দাম বেশি নয়। প্রত্যন্তে বয়ে নিয়ে যাওয়াটাই বেশি। আমরা নিয়ে যাব। কেনাকাটা পুরোটাই হবে স্থানীয় মানুষেরই কোনও দোকান থেকে। কথা হয়েছে। তাঁর জিনিসও বিক্রি হবে, বণ্টনও হবে। এখান থেকে জিনিস কিনে নিয়ে যাওয়ার খরচটাও বাঁচানো যাবে।

২। এর পরবর্তী পর্যায়ে গোসাবারই ৪০০ পরিবারকে একটি করে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, মশারি, টর্চ দেওয়া হবে। তাঁদের এটাই দরকার বলে জানিয়েছেন। সারা বছরের বস্ত্র-সংস্থান। তাঁরা অন্নের সমস্যায় পড়েননি আপাতত। খাবারটুকু আছে। এই জিনিসগুলোও কালকেই নিয়ে যেতে পারলে ভাল হতো, কিন্তু সম্ভব হয়নি। তাই পরের বার।

৩। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রামটির ১০টি পুকুর পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। পাম্পে করে নোনাজল সেচে ফেলে, পরিষ্কার করে দেওয়ার অনুরোধ করেছেন ওঁরাই। এবং এটাই সবচেয়ে জরুরি এই মুহূর্তে। জল নেই। আমাদের সদস্যরাও গিয়ে বুঝেছেন, প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে পানীয় জলের সমস্যা কী মারাত্মক! পানীয় ছাড়াও রান্না, স্নান বা কাপড় ধোয়ার জলটুকুও পাওয়া যাবে না, পুকুর ছাড়া। পুকুরগুলো আগের অবস্থায় ফেরানোর চেষ্টা করব আমরা। এ বিষয়েও কী কী করণীয়, তার বিস্তারিত কথা বলে আসা হয়েছে স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষদের সঙ্গে।

৪। কয়েক দিনের মধ্যেই মেডিক্যাল ক্যাম্প অ্যারেঞ্জ করতে হবে। জল নামতে শুরু করেছে, এই সময়টা পেটের অসুখ ও অন্যান্য সমস্যা তৈরির জন্য যেন একেবারে আদর্শ। প্রতিটা ঝঞ্ঝা, তুফান, বন্যার শেষেই এটা হয়। নিয়মিত ভাবে। সেখানে সামান্য পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করবে লাইটহাউস।

৫। বাঁধ ভেঙে জল ঢুকে সমস্ত জমি ভেসে যাওয়ার ফলে, পরবর্তী চাষবাসের পদ্ধতি সংকটে। নোনাজলে সিক্ত মাটিতে যে ফসল সবচেয়ে ভাল চাষ হবে, সে ফসলের বীজ জোগান দেব চাষিদের। এ বিষয়েও দু'পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে এবং কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে। এটা একটা খুব আশাজনক এবং সুদূরপ্রসারী কাজ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কারণ ত্রাণ এবং শুধুই ত্রাণ এই বিপর্যয় সামাল দিতে পারবে না কখনও। এটার মতো সত্য আর দ্বিতীয় কিছু নেই এই মুহূর্তে। ত্রাণের জোগান শেষ হলেও যেন খাবারে টান না পড়ে, তার জন্য কৃষি একটা বড় ভরসা মানুষগুলোর। আমরা চেষ্টা করব।

এই আমাদের আপাতত পরিকল্পনা, আমফান-বিধ্বসিত সুন্দরবন নিয়ে। আপনাদের মতামত স্বাগত। আপনাদের পাশে থাকাও স্বাগত। এখন লকডাউনের সময়ে সকলেরই রসদ সীমিত, আমরা জানি। তাই যে যেমন ভাবে পারেন পাশে থাকুন। এটা দীর্ঘমেয়াদি কাজ, ফলে আগামীতেও সঙ্গে থাকুন।

যাঁরা এতদিন ধরে আমাদের ভরসা করেছেন, অপেক্ষা করেছেন, বিশ্বাস রেখেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। যাঁরা অন্য কোনওখানে কোনওভাবে সাহায্য করে ফেলেছেন, তাঁদেরও শুভেচ্ছা। দুর্যোগে বিপন্ন মানুষের ভাল হোক। আমরা সকলেই সেটাই চাই।



আমাদের কাজ সম্পর্কে আরও জানতে সঙ্গে থাকুক...

13 views0 comments